পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস। পারস্য সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের এক মহাকাব্যিক ইতিহাস। পারস্য সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিহাস। পৃথিবীর প্রথম পরাশক্তি পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস। পারস্য সাম্রাজ্যের বিস্ময়কর ইতিহাস। পারস্য সাম্রাজ্যের আদ্যপান্ত।
পারস্যের ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছেন- সাইরাস দ্য গ্রেট, সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং অর্ধ পৃথিবীর শাসক খলিফা হযরত ওমর (রা)। ৫৫০ খ্রিঃপূঃ সাইরাস দ্য গ্রেটের নেতৃত্বে উত্থান হওয়া পারস্য সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে, ৬৫১ খ্রি. রাশেদিন খিলাফতের শাসনামলে।
পারস্য সাম্রাজ্য বলেতে কি বুঝায়?
পারস্য সাম্রাজ্য মূলত ৫৫০ খ্রিঃপূঃ থেকে ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পারস্য অঞ্চলেধারাবাহিকভাবে উত্থান-পতন হওয়া একেমেনিড, সেলুসিড, পার্থিয়ান এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের সামষ্টিক শাসনকালকে বুঝায়। এদের মধ্যে আকেমেনিড এবং সাসানীয় সাম্রাজ্য পারসিকদের এবং সেলুসিড ও পার্থিয়ান গ্রিকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য।
![]() |
| পারস্য সাম্রাজ্য |
পারসিক তথা ইরানিদের উৎপত্তি:
হাজার হাজার বছর পূর্বের কথা। মহাপ্লাবনের পর ইসলামের নবী হযরত নূহ (আ) সন্তানদের মাধ্যমে পৃথিবীতে পুনরায় মানবজাতির বংশবিস্তারের সূচনা হয়। নূহ (আ) এর তৃতীয় পুত্র ইয়াফাসের বংশধরগণ সাধারণত আর্য তথা ইরান, ভারতবর্ষ, মধ্য এশিয়া সহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এই জনগোষ্ঠী ইন্দো-ইরানীয় নামেও পরিচিত।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে মধ্য এশিয়া থেকে আর্য জাতির একটি দল ভারতীয় উপমহাদেশে এবং অপর একটি দল বর্তমান পারস্য অর্থাৎ ইরানে গমন করে করে। ফার্সি শব্দ এরান থেকে ইরান নামের উৎপত্তি যার অর্থ আর্যদের দেশ।
মেডেস সাম্রাজ্য:
আর্য জাতির মানুষেরা ছিল মেষপালক, যোদ্ধা এবং দক্ষ অশ্বারোহী। তারা ইসলাম ধর্মকে ভুলে গিয়ে অগ্নী, পানি, বায়ু এবং সূর্যের পূজা করতো। এই বিশ্বাস থেকে পরবর্তীতে পারস্যে জন্ম নেয় জরথুস্ত্রীয় ধর্ম। সময়ের সাথে সাথে মেডেস ও পার্সিয়ান নামক দুটি আর্য উপজাতীয় গোত্রে মিলে গঠন করে মেডেস এবং পার্সিয়া নামের দুটি প্রধান নগর রাজ্য। ৬২৫ খ্রিঃপূঃ সম্রাট সাইয়াক্সেরাস পার্সিয়া রাজ্য সহ বিভিন্ন রাজ্য, গোত্র ও উপজাতিকে একত্রিত করে মেডেস সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল- একবাটানা, যা আধুনিক ইরানের হামাদান শহর হিসেবে পরিচিত। মেডেস সাম্রাজ্য পরবর্তীতে আধুনিক ইরাক এবং তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। মেডেস সাম্রাজ্যের শেষ শাসক ছিলেন- এসটিজিয়াস। সম্রাট এসটিজিয়াসের এক কন্যার সন্তান সাইরাস- পার্সিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন। এই সাইরাসই ইতিহাসে সাইরাস দ্য গ্রেট নামে পরিচিত।
![]() |
| মিডিয়া সাম্রাজ্য |
একামেনিড সাম্রাজ্য:
উচ্চাভিলাষী, দক্ষ শাসক এবং বীর যোদ্ধা সাইরাস দ্য গ্রেট খ্রিঃপূঃ ৫৫০ অব্দে নিজ নানা এসটিজিয়াসকে পরাজিত করে মেডেস সাম্রাজ্য দখল করেন। ফলে মেডেস সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং সাইরাস দ্য গ্রেটের নেতৃত্বে উত্থান হয় পার্সিয়া তথা পারস্য সাম্রাজ্যের। সম্রাট সাইরাসের পরবর্তী শাসক সম্রাট দারিয়াসের পূর্বপুরুষ একামেনিসের নামানুসারে এটি পরবর্তীতে একেমেনিড সাম্রাজ্য নামেও পরিচিতি লাভ করে।
এই একামেনিড সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে যাত্রা শুরু হয় ইতিহাসের প্রথম পারস্যের সাম্রাজ্যের। একেমেনিড সম্রাট সাইরাস ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ এবং জনকল্যাণকামী শাসনকর্তা। তার প্রাণিত মানবহিতৈষী আইন এখনও জগৎ খ্যাত। এরপর তিনি পারস্যের লিডিয়া রাজ্য, মেসোপটেমিয়া তথা ইরাকের বিখ্যাত ব্যাবিলন রাজ্য দখল করেন।
তিনি ব্যাবিলন বিজয় করে বিশ্বাসঘাতক ইহুদিদের দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রদান এবং পুনরায় জেরুজালেম শহরে বসবাসের অনুমতি প্রদান করেন। তাই ইহুদিরা সম্রাট সাইরাসকে নিজেদের মুক্তিদাতা হিসেবে স্বরণ করে। সম্রাট সাইরাস প্যাসারগাড় শহর তৈরি করে সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন। পাশাপাশি তিনি জরথুস্ত্রীয় ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। একেমেনিড সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচিত করা হয় সম্রাট দারিয়াসকে।
![]() |
| আকামেনীয় সাম্রাজ্য |
তিনি পার্সেপলিস নগরীর গোড়াপত্তন করে শহরটিকে সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানীর মর্যাদা প্রদান করেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তিনি পৃথিবীর প্রথম অভিন্ন মুদ্রা প্রবর্তন, ডাক ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগ মহাসড়ক নির্মাণ করে পৃথিবীর ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। সম্রাট দারিয়াসের জীবনের প্রথম বিপর্যয় ৪৯০ অব্দে ম্যারাথনের যুদ্ধে।
এই যুদ্ধে ইউনিও ও এথেন্সের গ্রিকদের কাছে পারসিকরা প্রথমবারের মতে পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে। এই পরাজয় সম্রাট দারিয়াসের সম্মান ও প্রভাব অনেকটা ক্ষুন্ন হয়। পাশাপাশি এই যুদ্ধের মাধ্যমে গ্রিক পারসিক যুদ্ধের সূচনা হয়। যা পরবর্তীতে ১০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
![]() |
| সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট |
ম্যারাথন যুদ্ধের প্রায় ১০ বছর পর অর্থাৎ ৪৮০ অব্দে তাঁর পুত্র সম্রাট জারেক্সিসের শাসনামলে পারসিক এবং এথেন্স, স্পার্টা সহ বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের গ্রিকদের মধ্যে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক থার্মোপাইলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেও গ্রিকরা পরাজিত হয়। সম্রাট জারেক্সিস তার পিতা দারিয়াসের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে অনেক গ্রিককে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং বিখ্যাত এথেন্স শহর পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়।
৪৬৫ অব্দে সম্রাট জারেক্সিসের মৃত্যুর পর থেকে পারস্য সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকে। বিশেষ করে ব্যায়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সম্রাটদের বিলাসিতা, মন্ত্রীবর্গ এবং প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের দূর্নীতির কারণে রাজকোষ খালি হতে থাকে। মিশর, সাইপ্রাস, ফিনিশিয়া, ব্যাবিলন সহ অনেক রাজ্য কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়ে।
মেসিডোনিয়া সম্রাজ্য:
![]() |
| মেসিডোনিয়া সম্রাজ্য |
পারস্যের আকামেনীয় সাম্রাজ্যের পতনের যুগে গ্রিক নগররাষ্ট্র সমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে ৩৬০ অব্দে মেসিডোনিয়া সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয় ফিলিপ। ৩৩৬ অব্দে দ্বিতীয় ফিলিপের মৃত্যুর পর তার পুত্র আলেকজান্ডার মাত্র ২০ বছর বয়সে মেসিডোনিয়ার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন উচ্চাভিলাষী এবং বীরযোদ্ধা।
মাত্র ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ মহাদেশ ব্যাপি বৃহত্তর একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বিজয়ের ধারাবাহিকতায় ৩৩০ খ্রিঃপূঃ শেষ আকামেনীয় শাসক সম্রাট তৃতীয় দারিয়াসকে পরাজিত করে পারস্য দখল করেন গ্রীক বীর সম্রাট আলেকজান্ডার। ফলে প্রথমবারের মতো পারসিকদের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে গ্রিকরা।
এভাবে পতন ঘটে সাইরাস দ্য গ্রেট কতৃক প্রতিষ্ঠিত পারস্যের প্রথম সাম্রাজ্য- একামেনিড সাম্রাজ্যের। পারসকিকদের এথেন্স শহর ধ্বংসের প্রতিশোধ হিসেবে সম্রাট আলেকজান্ডার পারস্যের রাজধানী পার্সেপলিস শহরও পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেন। এটা তার জীবনের একটি কালো অধ্যায়। ৩২৩ অব্দে সম্রাট আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর, তার বংশধর ৩০৫ অব্দ পর্যন্ত পারস্য শাসন করে।
সেলিসিউড সাম্রাজ্য:
![]() |
| সেলিসিউড সাম্রাজ্য |
৩০৫ সম্রাট আলেকজান্ডারের বিখ্যাত সেনাপতি সেলিউকাস সিরিয়া, মেসোপোটেমিয়া এবং সমগ্র পারস্য দখল করে সেলিসিউড সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রিক সেলিসিউড সাম্রাজ্য খ্রিঃপূঃ ১৪২ অব্দ পর্যন্ত পারস্য শাসন করে। এই সময় গ্রিক ও পারসিক সংস্কৃতির সংমিশ্রণে এক নতুন জাতি ও সভ্যতার সৃষ্টি হয়।
সম্রাট তৃতীয় এন্টিউকাসের শাসনামলে সেলিসিউড সাম্রাজ্য উন্নতীর শীর্ষচূড়ায় আরোহন করেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর থেকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলা এবং রোমানদের আক্রমণের ফলে সেলিসিউড সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
অবশেষে খ্রিঃপূঃ ১৪২ অব্দে পার্থিয়ানদের আক্রমণের ফলে পতন ঘটে পারস্যের দ্বিতীয় সাম্রাজ্য- গ্রিক সেলিসিউড সাম্রাজ্যের। পার্থিয়ানরা গ্রিক না পারসিক জাতি; সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
পার্থিয়ান সাম্রাজ্য
![]() |
| পার্থিয়ান সাম্রাজ্য |
মধ্য এশিয়ার যাযাবর পার্নি উপজাতির নেতা প্রথম আর্সেসিস খ্রিঃপূঃ ২৪৭ অব্দে সেলিসিউড সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে পারস্যের পার্থিয়া রাজ্য দখল করে পার্থিয়া সাম্রাজ্যের ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করেন। রাজা মিথ্রিডেটেস-এর শাসনামলে পার্থিয়ান সাম্রাজ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
তিনি ১৪২ অব্দে সেলিসিউড সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটিয়ে- ইরান, ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানজুড়ে একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বিখ্যাত সিল্ক রোড পার্থিয়ানদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাঁরা অত্যান্ত ধনী এবং প্রভাবশালী হয়ে উঠে।
সাম্রাজ্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পার্থিয়ান সাম্রাজ্য এবং রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যকার সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধ ইতিহাস খ্যাত।
৫৩ অব্দে রোমান সম্রাট মার্কুস পার্থিয়ান সাম্রাজ্য আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে সম্রাট তৃতীয় মিথ্রিডেটেসের সেনাপতি সুরিনা রোমানদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হন। কিন্তু শক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলার কারণে পার্থিয়ান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
সাসানীদ সাম্রাজ্য:
![]() |
| সাসানীদ সাম্রাজ্য |
পারস্যের পার্থিয়ানদের দুর্বলতার সুযোগে পার্সের শাসনকর্তা আর্দেসিস ২২৪ খ্রিস্টাব্দে শেষ পার্থিয়ান শাসক সম্রাট চতুর্থ আরতাবানোসকে পরাজিত করে- পারস্যের তৃতীয় সাম্রাজ্য- পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটান এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। রাজা আর্দেসিসের পূর্বপুরুষ “সাসান” এর নামানুসারে সাসানীয় সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয়।
সাসানীয়রা ছিল পারসিক জাতির এবং তারা নিজেদের সাইরাস দ্য গ্রেটের আকামেনীয় সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী হিসেবে পরিচয় দিতো। তারা পারস্যের সরকারি ভাষা হিসেবে ফার্সি এবং রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে জরথুস্ত্রীয় ধর্মকে পুনঃপ্রচলন করে। ফলে দীর্ঘ প্রায় ৪০০ বছর পর পারস্যে পুনরায় পারসিকদের শাসনের সূচনা হয়।
সাসানীয় সাম্রাজ্যের সম্রাটগণ প্রথমবারের মতো শাহেন শাহ অর্থাৎ রাজাদের রাজা উপাধি গ্রহণ করেন। রাজধানী স্থাপন করেন- বর্তামান ইরাকের বাগদাদ হতে ৩৫ কিঃমি দক্ষিণে টেসিফোন শহরে। টেলিফোন ও এর পার্শ্ববর্তী ৭ টি শহরকে একত্রে মাদায়েন বা শহরসমূহ বলা হয়।
![]() |
| রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ |
২৪০ খ্রিস্টাব্দে পিতা আর্দেসির মৃত্যুর পর তার পুত্র সম্রাট শাহপুর সাসানীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার শাসনামলে সাসানীয় সাম্রাজ্যে সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে। তিনি রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সম্রাট সাহপুর ২৬০ খ্রিস্টাব্দে এডেসার যুদ্ধে রোমানদের পরাজিত এবং সম্রাট ভেলেরিয়ানকে বন্দী করেন।
এই ঘটনা শক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যের জন্য মারাত্মক অপমানকর ছিল। বলা হয় এই সময় থেকেই মহান রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়। অবশেষে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির শাসক ওডোসা শেষ রোমান সম্রাট রোমিউলাসকে পরাজিত ও ক্ষমতাচ্যুত করে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটান।
তবে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হলেও, ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টান্টাইন কতৃক প্রতিষ্ঠিত পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের উত্থানের মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্য হৃতগৌরব আবারও ফিরে পায়।
![]() |
| বায়জান্টাইন সাম্রাজ্য |
সাসানীয় সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচিত করা হয় সম্রাট প্রথম খসরু শাহকে। তার উপাধি ছিল- আনুশিরভান অর্থাৎ অমর আত্মা। সম্রাট প্রথম খসরুর শাসনামল ছিল ৫৩১ থেকে ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তার ৪৮ বছরের শাসনামলে সাসানীয় সাম্রাজ্য সমৃদ্ধির শীর্ষচূড়ায় আরোহণ করে।
বিশেষ করে রাজ্যবিজয়, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক সংস্কার, অপরাজেয় সামরিক শক্তি এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির উৎকর্ষতার জন্য তার শাসনকালকে সাসানীয় সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত করা হয়। সম্রাট প্রথম খসরুর শাসনামলে ৫৭০ খ্রি. আরবের মক্কা নগরীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) জন্মগ্রহণ করেন।
সাসানীয় সাম্রাজ্যের শেষ শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে অভিহিত করা হয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরুকে। তার উপাধি ছিল পারভেজ অর্থাৎ বিজয়ী। সম্রাট দ্বিতীয় খসরু পারভেজের শাসনামল ছিল ৫৯০-৬২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি বায়জান্টাইনদের পরাজিত করে জেরুজালেম, ফিলিস্তিন, মিশর এবং সিরিয়া দখল করে করে পারস্যের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করেন।
![]() |
| সম্রাট দ্বিতীয় খসরু পারভেজ |
এই বিজয়ের ফলে সম্রাট দ্বিতীয় খসরু পারভেজ খুবই দাম্ভিক ও অহংকারী হয়ে উঠেন। সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর শাসনামলে মহানবী (সা) এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়। এ সময় নবুয়ত লাভ থেকে শুরু করে ইসলাম প্রচার, মদিনা হিজরত এবং বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ এবং হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে মহানবী (স) আরবের মাটিতে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মদিনা কেন্দ্রিক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মুসলিম জাতি গঠন করেন।
মহানবী (স) ৬২৮ খ্রি. মক্কার কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধি করার মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করেন। এরপর তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দূত প্রেরণ করেন। তিনি সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর নিকট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে হুযায়ফা (রা) কে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে প্রেরণ করেন।
কিন্তু দাম্ভিক ও অহংকারী সম্রাট দ্বিতীয় খসরু মহানবীর (সা) পত্র ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ছিঁড়ে ফেলে এবং মুসলিম দূতকে অপমান করে। এই ঘটনা শুনে মহানবী (সা) খুবই মর্মাহত হয়ে ভারাক্রান্ত মনে বলেছিলেন, মহান আল্লাহ একদিন পারস্যের সাসানীদ সাম্রাজ্যেকেও এভাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করে দিবেন। মূলত এই সময় থেকে পারস্যের সাসানীদ সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়।
![]() |
| মহানবীর (স) চিঠি |
অহংকারী সম্রাট দ্বিতীয় খসরু এবার বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন। কিন্তু তার এই অবরোধ ব্যার্থতায় পর্যবাসিত হয়। পাশাপাশি তিনি বায়জান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের স্বীকার হন। ফলে তার মর্যাদা ও প্রভাবপ্রতিপত্তি ক্ষুন্ন হয়। শেষপর্যন্ত তিনি অপমানিত ও লাঞ্চিত হয়ে নিজ পুত্র সম্রাট দ্বিতীয় কাভাদ কতৃক বন্দি ও হত্যার স্বীকার হন।
মহানবী (সা) কে অপমানের ফল সম্রাট দ্বিতীয় খসরু দুনিয়াতেই ভোগ করেন! সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়। ক্ষমতার দ্বন্দের কারণে পরবর্তী সম্রাটদের কেউ ১ বছরের অধিক সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারেনি। শুধুমাত্র শেষ সম্রাট দীর্ঘসময় ক্ষমতায় ছিলেন। পাশাপাশি বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের আক্রমণে সাসানীয় সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
পারস্য সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন:
![]() |
| মুসলমানদের পারস্য বিজয় |
সাসানীয় সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন তৃতীয় ইয়াজদিগার্দ। তার শাসনামল ছিল- ৬৩৩ থেকে ৬৫১ খ্রি. পর্যন্ত। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং অর্ধ পৃথিবীর শাসক হযরত ওমর (রা) এর শাসনামলে মহানবী (সা) এর ভবিষ্যতবাণী বাস্তবে পরিণত হয়। সেনাপতি সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) সহ অসংখ্য বীর সিনানীর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পারসিকদের পরাজিত করে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য বিজয় করতে সক্ষম হয়।
ফলে পারসিক জাতি অগ্নিপূজাসহ যাবতীয় কুসংস্কারচ্ছন্ন জরথুস্ত্রীয় ধর্ম ত্যাগ করে পুনরায় পৃথিবীর একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলামের সুশীতল ছায়াতল আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ইসলামের প্রচার প্রসার ও সাম্রাজ্য বিস্তারে পারসিক মুসলিম জাতির অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
৬৫১ খ্রি. হযরত ওসমানের (রা) শাসনামলে পারস্যের সাসানীদ সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ ১০০০ বছরের পারস্য সাম্রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাসের অবসান ঘটে এবং পারস্যের ইতিহাসের নতুন যুগের সূচনা হয়।
লেখক এবং সম্পাদক:
মো: এমরান হোছাইন
বি.এ, এম.এ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি,
বান্দরবান কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ।
Contet Creator
YouTube: 1. Baitul Hikmah by Imran
Facebook ID: Md Imran Hossain
Email : mdimranh.bd95@gmail.com














Post a Comment