YouTube Ad

পরস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস।

পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস। পরস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস। পারস্য সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের ইতিহাস। কিভাবে পারস্যে সাম্রাজ্যের পতন ঘটে? মুসলমানদের পারস্য বিজয়ের ইতিহাস।

পারস্যের পার্থিয়ানদের দুর্বলতার সুযোগে পার্সের শাসনকর্তা আর্দেসিস ২২৪ খ্রিস্টাব্দে শেষ পার্থিয়ান শাসক সম্রাট চতুর্থ আরতাবানোসকে পরাজিত করে- পারস্যের তৃতীয় সাম্রাজ্য- পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটান এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। রাজা আর্দেসিসের পূর্বপুরুষ “সাসান” এর নামানুসারে সাসানীয় সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয়। সাসানীয়রা ছিল পারসিক জাতির এবং তারা নিজেদের সাইরাস দ্য গ্রেটের আকামেনীয় সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী হিসেবে পরিচয় দিতো।


তারা পারস্যের সরকারি ভাষা হিসেবে ফার্সি এবং রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে জরথুস্ত্রীয় ধর্মকে পুনঃপ্রচলন করে। ফলে দীর্ঘ প্রায় ৪০০ বছর পর পারস্যে পুনরায় পারসিকদের শাসনের সূচনা হয়। সাসানীয় সাম্রাজ্যের সম্রাটগণ প্রথমবারের মতো শাহেন শাহ অর্থাৎ রাজাদের রাজা উপাধি গ্রহণ করেন। রাজধানী স্থাপন করেন- বর্তামান ইরাকের বাগদাদ হতে ৩৫ কিঃমি দক্ষিণে টেসিফোন শহরে। টেসিফোন ও এর পার্শ্ববর্তী ৭ টি শহরকে একত্রে মাদায়েন বা শহরসমূহ বলা হয়।


২৪০ খ্রিস্টাব্দে পিতা আর্দেসির মৃত্যুর পর তার পুত্র সম্রাট শাহপুর সাসানীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার শাসনামলে সাসানীয় সাম্রাজ্যে সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে। তিনি রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সম্রাট সাহপুর ২৬০ খ্রিস্টাব্দে এডেসার যুদ্ধে রোমানদের পরাজিত এবং সম্রাট ভেলেরিয়ানকে বন্দী করেন।

রাজধানী- টেসোফোন

এই ঘটনা শক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যের জন্য মারাত্মক অপমানকর ছিল। বলা হয় এই সময় থেকেই মহান রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়। অবশেষে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির শাসক ওডোসা শেষ রোমান সম্রাট রোমিউলাসকে পরাজিত ও ক্ষমতাচ্যুত করে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তবে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হলেও, ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টান্টাইন কতৃক প্রতিষ্ঠিত পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের উত্থানের মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্য হৃতগৌরব আবারও ফিরে পায়।


সাসানীয় সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচিত করা হয় সম্রাট প্রথম খসরু শাহকে।

তার উপাধি ছিল- আনুশিরভান অর্থাৎ অমর আত্মা। সম্রাট প্রথম খসরুর শাসনামল ছিল ৫৩১ থেকে ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তার ৪৮ বছরের শাসনামলে সাসানীয় সাম্রাজ্য সমৃদ্ধির শীর্ষচূড়ায় আরোহণ করে।


বিশেষ করে রাজ্যবিজয়, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক সংস্কার, অপরাজেয় সামরিক শক্তি এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির উৎকর্ষতার জন্য তার শাসনকালকে সাসানীয় সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত করা হয়। সম্রাট প্রথম খসরুর শাসনামলে ৫৭০ খ্রি. আরবের মক্কা নগরীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। 

সম্রাট খসরুর প্রবর্তিত মুদ্রা

সাসানীয় সাম্রাজ্যের শেষ শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে অভিহিত করা হয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরুকে। তার উপাধি ছিল পারভেজ অর্থাৎ বিজয়ী। সম্রাট দ্বিতীয় খসরু পারভেজের শাসনামল ছিল ৫৯০-৬২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি বায়জান্টাইনদের পরাজিত করে জেরুজালেম, ফিলিস্তিন, মিশর এবং সিরিয়া দখল করে করে পারস্যের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করেন।


এই বিজয়ের ফলে সম্রাট দ্বিতীয় খসরু পারভেজ খুবই দাম্ভিক ও অহংকারী হয়ে উঠেন। সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর শাসনামলে মহানবী (সা) এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়। এ সময় নবুয়ত লাভ থেকে শুরু করে ইসলাম প্রচার, মদিনা হিজরত এবং বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ এবং হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে মহানবী (স) আরবের মাটিতে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মদিনা কেন্দ্রিক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মুসলিম জাতি গঠন করেন।

মহানবীর (স) প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্র

মহানবী (স) ৬২৮ খ্রি. মক্কার কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধি করার মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করেন। এরপর তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দূত প্রেরণ করেন। তিনি সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর নিকট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে হুযায়ফা (রা) কে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে প্রেরণ করেন।


কিন্তু দাম্ভিক ও অহংকারী সম্রাট দ্বিতীয় খসরু মহানবীর (সা) পত্র ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ছিঁড়ে ফেলে এবং মুসলিম দূতকে অপমান করে। এই ঘটনা শুনে মহানবী (সা) খুবই মর্মাহত হয়ে ভারাক্রান্ত মনে বলেছিলেন, মহান আল্লাহ একদিন পারস্যের সাসানীদ সাম্রাজ্যেকেও এভাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করে দিবেন। মূলত এই সময় থেকে পারস্যের সাসানীদ সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়।

সাসানীয় সাম্রাজ্য

অহংকারী সম্রাট দ্বিতীয় খসরু এবার বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন। কিন্তু তার এই অবরোধ ব্যার্থতায় পর্যবাসিত হয়। পাশাপাশি তিনি বায়জান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের স্বীকার হন। ফলে তার মর্যাদা ও প্রভাবপ্রতিপত্তি ক্ষুন্ন হয়। শেষপর্যন্ত তিনি অপমানিত ও লাঞ্চিত হয়ে নিজ পুত্র সম্রাট দ্বিতীয় কাভাদ কতৃক বন্দি ও হত্যার স্বীকার হন।


মহানবী (সা) কে অপমানের ফল সম্রাট দ্বিতীয় খসরু দুনিয়াতেই ভোগ করেন! সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়। ক্ষমতার দ্বন্দের কারণে পরবর্তী সম্রাটদের কেউ ১ বছরের অধিক সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারেনি। শুধুমাত্র শেষ সম্রাট দীর্ঘসময় ক্ষমতায় ছিলেন। পাশাপাশি বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের আক্রমণে সাসানীয় সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। 


মুসলমানদের অভিযান এবং পারস্য সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন:                                     

মুসলমানদের পারস্য বিজয়

সাসানীয় সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন তৃতীয় ইয়াজদিগার্দ। তার শাসনামল ছিল- ৬৩৩ থেকে ৬৫১ খ্রি. পর্যন্ত। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং অর্ধ পৃথিবীর শাসক হযরত ওমর (রা) এর শাসনামলে মহানবী (সা) এর ভবিষ্যতবাণী বাস্তবে পরিণত হয়। সেনাপতি সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) সহ অসংখ্য বীর সিনানীর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পারসিকদের পরাজিত করে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য বিজয় করতে সক্ষম হয়।


পারসিক জাতি অগ্নিপূজাসহ যাবতীয় কুসংস্কারচ্ছন্ন জরথুস্ত্রীয় ধর্ম ত্যাগ করে পুনরায় পৃথিবীর একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলামের সুশীতল ছায়াতল আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ইসলামের প্রচার প্রসার ও সাম্রাজ্য বিস্তারে পারসিক মুসলিম জাতির অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ৬৫১ খ্রি. হযরত ওসমানের (রা) শাসনামলে পারস্যের সাসানীদ সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ ১০০০ বছরের পারস্য সাম্রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাসের অবসান ঘটে এবং পারস্যের ইতিহাসের নতুন যুগের সূচনা হয়।


Written By

Md Imran Hossain

B.A & M.A in Dept. of Islamic History and Culture.

University of Chittagong

Lecturer (Islamic History and Culture) in a college

Contet Creator

YouTube: History TV Bangla

Facebook ID: Md Imran Hossain

Post a Comment

أحدث أقدم